Breaking News

ইরাবতী ও একটি ভালবাসার গল্প




অনেক আগেই ঘুম ভাঙ্গে ছিলো,বউয়ের ডাক শুনার জন্য ঘুমের ভান করে শুয়ে আছি...

-কি ব্যাপার আটটা বাজে,আজ কি অফিসে যাবা না..? (ইরা)

বলেই জানালার পর্দাটা সরিয়ে দিল..(ইরা)
সকালের মিষ্টি আলোটা চোখে এসে পড়লো...

বিছানার পাশেই ভেজা চুলগুলো ঝাড়তে শুরু করে ইরা..
ভেজা চুলের ফোটা ফোটা পানিগুলো এসে নাকে মুখে পড়ছে..
অন্য রকম একটা অনুভূতি নাড়া দিয়ে উঠলো ভিতরটায়...
ইরার হাতটা ধরে হেঁচকা টান দিয়ে কাছে টেনে নিয়ে কপালে একটা সুখের আবিরতা একে দিয়ে বললাম.. ভালোবাসি..ভালোবাসি...ভালোবাসি...

ইরাও নাকটা হালকা টেনে বললো..

ভালোবাসি...ভালোবাসি...ভালোবাসি...

এমন ছোট খাটো ভালবাসি বলাটা একটা প্রতিদিনের রুটিন হয়ে গেছে...

ভালোবাসাটা বাড়ছে ধীরে ধীরে,কখনই কমেনি আমাদের...
পাঁচ বছর হলো ইরাবতী কে বিয়ে করেছি...

একটুখানি মন খারাপ করতে দেইনি ইরা কে,
ইরাবতীর খুশিতে আমার খুশি...
লাভ ম্যারিজ ছিলো আমাদের..

দুজন দুজনকেই খুব বেশী বুঝি, তবে ইরাবতী আমাকে একটু বেশীই বুঝে....

ইরা কখনও তেমন কিছু দাবি করতো না,জিজ্ঞেসা করলে বলতো আমি থাকলে তার যথেষ্ট...

ইরা কে ভালবেসে ইরাবতী বলে ডাকতাম...

ইরার খুব লজ্জা লাগতো, আবার অনেক ভালোও লাগতো...

ইরাবতীও ছিলো আমার পৃথিবী,ইরা কে ছাড়া কিছু ভাল লাগতো না...
তাই তো অফিসে যাওয়ার আগে ইরাবতী কে বলতাম....
আমার রুমাল কোথায়?
আমার মোবাইল কোথায়..?
আমার টাইটা কোথায়..?
আমার ফাইল কোথায়..?
এইটা কই ওইটা কই নানা কথা বলে ইরাবতী কে অস্থির করে ফেলতাম....

এমনকি টাই টাও নিজ হাতে বাধা শিখেনি কারন ইরাবতী বেধে দেবে বলে..
বড্ড ক্লান্ত হয়ে যেত ইরাবতী, কিন্তু বলতো না....

অফিসে যাওয়ার সময় যখন ইরার কপালে আলতো করে চুমু দিয়ে বলতাম...

সারাদিন তোমায় অনেক মিস করবো ইরাবতী...

তখনই যেন ইরার সমস্ত ক্লান্তি নিমিষেই দূর হয়ে মুখে কোণে সুখের হাসি ফুটে উঠতো...

তখনই পরম বিশ্বাসে মাথা এলিয়ে দিত ইরাবতী বুকের মাঝখানটায়....
এত সুখের মাঝেও দুঃখটাও আছে পাশাপাশি..

বরাবরই দুঃখটাকে লুকানোর চেষ্টা করে আসছি..
ইরা প্রতিদিন ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাদে..
ইরার নিঃশব্দে কান্নাটা আমার বুকে তীরে মত লাগতো...

যখনই ইরার চোখের জলগুলো আমার বুকে পড়তো, ইরাকে দুরে সরিয়ে রাগ করে বলতাম..

'আবার কান্নাকাটি করলে আমি কিন্তু মরে যাবো '
এটা বলে ইরা কে ধরে কান্না করতাম....

এভাবেই প্রতিদিনের সুখের নেয় কষ্টটাও ঢেকে যেতো..
ইরা কষ্টটা একটু বেশিই অনুভব করতো বুঝতে পারতাম...

দুই বছর আগের কথা.....

ছয় মাসের অন্তঃস্বত্তা আমার ইরা...

বেশ সুখেই চলছিল ইরাবতী আর আমার ভালবাসার দিনগুলো..
বিশেষ্য করে ইরার পেটে আস্তে আস্তে বড় হওয়া আমাদের ভবিষ্যটাই ছিলো ভালবাসার আর একটা মাধ্যম...

ইরার পেটের ভেতর থাকা বাচ্চা টা পা দিয়ে ধাক্কা মারে যখন তখন ইরা ব্যাথায় কাতরে ওঠে..
এটা দেখে হেসে হেসে প্রায় প্রাণ যেত...
অপর দিকে ইরাবতী রেগে গিয়ে বলতো..
তোমার মতোই দুষ্টু হবে..ফাজিল একটা হবে...

একদিন দুপুর বেলা ড্রইং রুমে বসে টিভি দেখছিলাম....

ইরাবতীর চিৎকার শুনে দ্রোড়ে গেলাম...

রুমের ভিতরটাতে তাকাতেই পৃথিবীটা অন্ধকার হয়ে আসছে আমার...

রুমের ভিতরটা রক্তে লাল হয়ে গেছে..
আমার ইরাবতী যন্ত্রনায় ছটফট করছে..

এরপরের ঘটনাটা স্বাভাবিক হতে পারতো...

কিন্তু,ভাগ্যে হয়তো বা অস্বাভাবিক কিছু লেখা ছিল..

বিছানার সাথে হোচট খেয়ে পড়ে গিয়ে পেটে প্রচন্ড আঘাতের পায় ইরাবতী...
সেই সাথে মা হবার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে চিরদিনের জন্য ইরাবতী...

এটা ভেবে ইরা শুধু কেঁদে যায়,আমি ইরাবতীর হাত ধরে মাথাটা বুকে রেখে মিথ্যা শান্তনা দিতে থাকি..

পাগলীরর মত কাঁদছো কেন উপরওয়ালা হয়তো আরো বড় কোন উপহার রেখেছে আমাদের জন্য..
দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে পাগলী....
কেঁদো না তো ইরাবতী তোমার কান্না আমার বুকে যে তীরের মত বিঁধে...
আর তাহলে আমিওও কান্না করবো...

সেই মুহূর্তগুলো খুবই কষ্টকর...

ইরাবতী এখন রাতের বেলা বারান্দায় একা একা বসে আছে...
পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে আকাশের দিকে আঙুল দেখিয়ে বললাম....

ওই যে চাদটা দেখছো না...
তার পাশের তারাটাই আমাদের বাবুটা...

মনটা যেন আরো ভারী হয়ে যায় ইরাবতীর...
ভারি মনটা আর ধরে রাখতে না পেরে পাগলীটা বুকে মাথাটা এলিয়ে দেয় একটু পরম সুখের খোজে...

ইরাবতীর কপালে আমিও সুখের আবিরতা এঁকে দিয়ে বলতাম....
ভালোবাসি...ভালোবাসি...ভালোবাসি...

কী অদ্ভুত এই ভালবাসাটা তাই না..?
এই ভালবাসায় নেই কোন খাদ নেই কোন কমতি..
ইরাবতীর জন্য রয়েছে অফুরন্ত ভালবাসা, যা কোন দিন শেষ হবার নয়....

কিন্তু কমতি থেকে যাবে শুধু ইরাবতীর মা হবার স্বাদটা..
এমনটা যেন কোন ইরাবতীর কপালে না হয়....

No comments